ইসলামিকজীবন - মৃত্যু - জীবন

হাশরের ময়দান ।। হাশরের ময়দানের অবস্থা কেমন হবে? (জীবন – মৃত্যু – জীবন: পর্ব ৫)

—–হাশরের ময়দান —–

বিচার দিবস শুরু হয়ে গেছে আপনি ছুটে যাচ্ছেন একটি গন্তব্যে। আপনার চারিপাশে অগণিত মানুষ জিন  এবং পশু পাখিরা ও ছুটছে। উত্তপ্ত গরম এবং সূর্যটা যেন একেবারে কাছে চলে এসেছে কতদূর ধরে চলেছেন তা আপনি জানেন না। কিন্তু অবশেষে সবাই থেমে যায় সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এত বিশৃংখলার মাঝেও মনে হচ্ছিল মানুষ  নিদৃষ্ট দলে দলে বিভক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদল লোক দূরে দাঁড়িয়ে ছিল সূর্যের তাতে তাদের শরীর থেকে অনবরত ঘাম ঝরতে শুরু করেছে ।সেই ঘাম মাটিতে জমা হতে হতে তাদের টেকনো পর্যন্ত যামে ডুবে গিয়েছিল।তাদের থেকে আরেকটু দূরে আরেকদল লোকেরা গামছিল তাদের গাম এত বেশি হচ্ছিল যে তারা নিজেদের গামে হাটু পর্যন্ত ডুবে ছিল।

এই পরিমান আস্তে আস্তে বাড়তে থাকল এবং কেউ কেউ কোমর পর্যন্ত ডুবেছিল কেউ কেউ বুক পর্যন্ত কেউ কেউ গলা পর্যন্ত আর কেউ কেউ পুরোপুরি ডুবে ছিল। রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতিটি বক্তব্যের মতো এই বক্তব্যটি সত্য প্রমাণিত হলো। তিনি আমাদের বলে রেখেছিলেন হাশরের ময়দানে মানুষ তার পাপ অনুযায়ী ঘামতে থাকবে এবং একেক দলের লোকের পরিণতি একেক ধরনের হবে।

আরেকটু দূরে আপনি দেখতে পেলেন একদল নিষ্পাপ শিশু কিন্তু তাদের চুলগুলি পুরোপুরি পেকে গিয়েছে। তারা নিজেরা শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেছিল। বিচার দিবসে আসলে ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই কিন্তু আসলে গোটা মানবজাতিকে এত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে দেখে সেই নিষ্পাপ শিশুর এতই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল যে তাদের চুল পেকে গিয়েছিল ।ঠিক যেমনটা আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছিলেন।

“ তোমরা যদি মানতে অস্বীকার করো তাহলে সেদিন কিভাবে রক্ষা পাবে “

এত উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা এত আহাজারি আর হাহাকার ও অস্থিরতা আর এত কষ্টের মাঝে আপনি এত শান্তভাবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন। বিষয়টির লক্ষ্য করে আপনি নিজেই চমকে গেলেন আপনার আশেপাশের মানুষগুলো যথেষ্ট শান্তিপূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। তখনই আপনি লক্ষ করলেন আপনারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন সেখান থেকে একটি বিশাল অংশ জুড়ে একটি নির্মল ছায়া বিরাজ করছিল। শুধু তাই নয় ছায়ার সাথে বিরাজ করে এক অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করছিল সেখানে।

আপনার মনে পড়ে যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সেই বাণী। সাত ধরনের মানুষকে আল্লাহ তা’আলা তার ছায়ায় আশ্রয় দিবেন যেদিন তার ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না। তারা হল ন্যায় পরায়ন নেতা, যে যুবক বা যুবতীকে আল্লাহর ইবাদত করে বড় হয়েছে, যে ব্যক্তির হৃদয় মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত, যে দুজন ব্যক্তি আল্লাহরস্তে  একে অপরকে ভালবাসে দেখা করে এবং বিদায় নেয়, যে ব্যক্তি সমাজের একজন প্রতিষ্ঠিত নারী জিনার আমন্ত্রণ জানায় কিন্তু সে সেটাকে প্রত্যাখ্যান করে, যে ব্যক্তি দান করার সময় এমন ভাবে গোপন করে যে তার বাঁ হাত জানেনা সে ডান হাত দিয়ে কি দান করেছে।

যে ব্যক্তি গোপনে আল্লাহর কথা স্মরণ করে এবং তার চোখ ভিজে যায়। এর বাইরে ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন মানুষের কথা বলেছিলেন যারা তাদের ভাল কাজগুলোর জন্য কেয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় জায়গা পাবে।

যেমন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধের সময় বৃদ্ধি করে দেওয়া, আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করা, এতিমদের দেখাশোনা করা , আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা, সুন্দর আচরণ করা ইত্যাদি।

আপনি জানেন না কোন ভাল কাজ গুলোর জন্য আপনি আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পেয়েছেন ।কিন্তু আপনি আশ্চর্য হয়ে দেখছেন একই হাশরের ময়দানে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা। কয়েক দল লোকের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তারা বছরের পর বছর এই হাশরের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের শরীর থেকে ঘাম ঝরছে কৃষ্ণার ছাপ তাদের চোখে মুখে লেগে আছে। অন্যদিকে যারা আল্লাহর আরশের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে তাদেরকে দেখে মনে হবে তাদেরকে যেন কয়েক মুহূর্ত আগেই পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে।

আপনার মনে পড়ে যায় আল্লাহ তা’আলা বলেন।

“  ফেরেশতারা এবং রুহ তার দিকে উঠে যায় এমন একটি দিনে যা 50 হাজার বছরের সমান “

অবিশ্বাসীদের জন্য সেই দিনটি মনে হবে 50 হাজার বছরের সমান। এবং সেই দিন আল্লাহর নেয়ামত প্রাপ্ত বান্দাদের কাছে মনে হবে সেই সময় যেন যোহর এবং আসরের  মাঝা-মাঝি সময়ের সমান। তবে বিশ্বাসী অবিশ্বাসী নির্বিশেষে ক্ষতিটা সৃষ্টি কিছুটা উদ্বিগ্ন থাকবে।

আল্লাহ তখনও তার বান্দাদের সাথে একটা কথাও বলেননি। তিনি নিশ্চয়ই রেগে আছেন। সবাই অপেক্ষা করছে বিশ্বজগতের স্রষ্টা যিনি জীবনভর আমাদের সময় দিয়েছেন আমাদের আহ্বান করে গেছেন ভুল হলে ক্ষমা করে দিয়েছেন ।বারবার সুযোগ দিয়েছেন আমরা যেন তার দিকে ফিরে যাই। তার সেই আহ্বান অগ্রাহ্য করেছে কত কোটি কোটি বান্দা। আজ নিশ্চয়ই  তিনি রেগে আছেন। তার চূড়ান্ত বিচারের জন্য সবাই অপেক্ষা করছে ।যারা নিজেদের কুকর্মের ঘামে ডুবে আছে এবং যারা শান্তিময় ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছেন তারা সবাই অপেক্ষা করছে।

কিন্তু আল্লাহ কোন কথা বলছেন না । অপেক্ষা করতে করতে সবাই তৃষ্ণা অনুভব করতে লাগলো ।কিন্তু পানি কোথায় যতদূর চোখ যায় শুধু সমতলভূমি কিন্তু হঠাৎ হয়তো দু-এক সেকেন্ড পর আবার হয়তো 2-1 মিনিট পর আবার হয়তোবা কয়েক হাজার বছর পর বলা মুশকিল কেননা সময় এখন বিভিন্ন মানুষের জন্য বিভিন্ন নিয়মে চলছে।

হঠাৎ করেই শোনা গেল একটি শব্দ ।পানি পানি উঠে এসেছে নির্মম মরুভূমির জলশূন্য 1 টি বিরাট জায়গাজুড়ে পানি উঠে এলো ,তৈরি হল এক বিরাট পুকুর কিন্তু এমন এক পুকুর যা কল্পনাকেও হার মানায়। এত বিশাল সেই পুকুর চারপাশে কোটি কোটি মানুষ মানুষের তো সেখানে হুমরি খেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা ।কিন্তু না কেউ নড়তে পারছে না কেননা অনুমতি নেই ।এইপানি শুধুমাত্র  বিশ্বাসিদের জন্য। প্রতিটি মুমিন ব্যক্তি তার জায়গা থেকে সেই পুকুরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। আপনি হেঁটে যাচ্ছেন আপনার মুখ আপনার পা ওযু করার সময় যে যে অঙ্গ গুলো দিয়েছেন সেই অঙ্গগুলো থেকে একটি পবিত্র নূর বেরিয়ে আসছে।

গোটা মানবজাতির সেদিন আফসোস করবে কেন তারা আজ এই দলের অংশ হতে পারল না ।এই দলে রয়েছে সেই নিষ্পাপ পরিবার যাদের ঘর বাড়ি ঘর করে দিয়েছিল জালিম সব নেতারা। সেই জালিম নেতা দাঁড়িয়ে দেখছে উজ্জ্বল সব মুখগুলো হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে  হেঁটে যাচ্ছে পুকুরের নিকট। এই দলে রয়েছে সেই যুবক লোকেরা যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী কাপড় পরিধান করায় তার বন্ধু-বান্ধবরা এমনকি আত্মীয়-স্বজনরাও খোটা কথা বলতো বলতো সে কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গেছে।

আজ সে আসলেই অন্যরকম সে হেঁটে চলছে সেই পুকুর পাড়ে আর বাকিরা সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। অনেকটা পথ হেঁটে কুকুরটির দেখা মিলল। যেদিন প্রথম সমুদ্র দেখেছিলেন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলেন কয়েক মিনিট।যেদিন প্রথম  পূর্ণিমার রাতে সাগর দেখেছিলেন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলেন কয়েক ঘন্টা। আজ মনে হয় 50 হাজার বছর মুগ্ধ হয়ে কাটিয়ে দিতে পারবেন।

পুকুরটিকে দেখেই যেন আপনার সব তৃষ্ণা মিটে গেল হয়তো আপনি সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতেন হয়তো আর কোথাও যেতে চাইতেন না। হঠাৎ আপনার চোখ চলে যায় পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ব্যাক্তিটির দিকে ।তার থেকে এত উন্নত ছিল যে তাকে দেখাই কঠিন হয়ে যাচ্ছিল ।কিন্তু আস্তে আস্তে আপনি তাকে দেখতে পেলেন ।কাজ সমান ডেউ খেলানো চুল মুখে কালো দাড়ি আর মনমুগ্ধকর হাসি সামনের দাঁত দুটোর মাঝে একটি ছোট্ট ফাক ।আপনি তার দিকে তাকিয়ে আছেন আর একটু পর বুঝতে পারলেন তিনিও আপনার দিকে তাকিয়ে আছে আপনাকে ডাকছে। পরম আনন্দের সেই মুহূর্তগুলো কাটাতে লাগলেন আপনি ঘুরের মধ্যে ।

তিনি আপনাকে নিজ হাতে পুকুর থেকে পানি তুলে দিলেন আপনি সেই পানি পান করলেন সেই পানি পান করা মাত্রই আপনি বুঝে গেলেন আপনি আর কখনো তৃষ্ণা অনুভব করবেন না। কারণ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা রাসূল সাঃ আপনাকে নিজ হাতে মহিমান্বিত হাউজে কাউসার থেকে পানি পান করিয়ে দিয়েছেন ।আপনি আর কখনোই তৃষ্ণার্ত হবেন না।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close