ইসলামিকজীবন - মৃত্যু - জীবন

সিরাত (জীবন – মৃত্যু – জীবন, পর্ব ৮) |

“যেদিন জাহান্নাম সামনে আনা হবে ।সেদিন মানুষ বুঝবে কিন্তু তার বুঝতে পারায় কি লাভ? সেদিন বলবে হাই যদি আমি নিজের জীবনের জন্য কিছু আগাম ব্যবস্থা করতাম। “

মিজানের পাল্লায় আমলের ওজন এরপর জাহান্নামকে সামনে আনা হবে মুসলিম হাদিসে বর্ণিত আছে জাহান্নামে থাকবে 70হাজার শিকল প্রতিটি  শিকলে ধরে থাকবে 70 হাজার ফেরেশতা।কিন্তু জাহান্নাম সেদিন এতটা ক্ষুব্ধ থাকবে যেই শত শত কোটি ফেরেশতা মিলে তাকে সামলাতে হিমশিম খাবে ।এরপর মানুষকে দলে দলে ভাগ করা হবে যারা উম্মাতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারা একদলে থাকবে যারা উম্মতের ঈসা আলাইহিস সালাম তারা আরেকটা দলে থাকবে। তেমনি ভাবে যারা শিরিক করেছে তারাও বিভিন্ন দলে দলে বিভক্ত হয়ে যাবে।

“হুকুম দেয়া হবে যারা করে নিয়ে আসো সব জালেম কে, তাদের সাথীদেরকে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব মাবুদ কে তারা বন্দেগী করতো তাদেরকে , তারপর তাদের সবাইকে জাহান্নামের পথ দেখিয়ে দাও।“

মুশফিকদের দলগুলোকে সরাসরি জাহান্নামে ফেলে দেয়া হবে আল্লাহ যেন আমাদের প্রকাশ্য এবং গোপন শিরিক থেকে হেফাজত করেন। এরপর রয়েছে  তাওহীদের মানুষেরা, যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করেনি। কিন্তু এর মধ্যেও রয়েছে ভালো এবং খারাপ। ভালোর মধ্যে থাকবে প্রকৃত মুমিন ব্যক্তিরা, যারা হিসাব ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং যাদের হিসাব নেয়ার পর তাদের ভালো কাজের পাল্লা ভারী হয়েছে।

আর খারাপ দের দলে থাকবে তারা যারা কবিরা গুনা করে অথবা তওবা করেনি এবং সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে মোনাফেকরা যারা তখনও পর্যন্ত বিশ্বাসিদের দলে রয়েছে এবং তখন পর্যন্ত তারা আল্লাহর সাথে পরিকল্পনা করছে তাকে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু অতি শীঘ্রই তারা টের পেয়ে যাবে সকল পরিকল্পনাকারীদের উপর পরিকল্পনা করেন আল্লাহ।

মুর্শিদের জাহান্নামে ফেলে দেয়ার পর জাহান্নামের উপর দিয়ে বসানো হবে একটি সেতু ব্রিজ যাকে বলা হয় সিরাত। এই সেই সিরাত যাকে পাড়ি দিতে হবে অবশিষ্ট প্রতিটি বান্দাকে। সিরাত হবে অত্যন্ত পিচ্ছিল তলোয়ারের চেয়েও ধারালো এবং চুলের  চেয়ও চিকন। এর চারিপাশে থাকবে অগণিত আক্রা যা নির্দিষ্ট মানুষকে আঁকড়ে ধরবে এইগুলো হবে মানুষের বিভিন্ন পাপের সাথে সম্পৃক্ত ।

যার যার যে পাপ তখনো ক্ষমা করা হয়নি সেই পাপ এসে তাকে আঁকড়ে ধরে জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। পৃথিবীতে যেমন দিনের পর রাত্রি আসে কিয়ামতের দিবসেও ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসবে। রাতের দিকে যেতে যেতে চারিদিকে অন্ধকার হয়ে যাবে । তখন বিশ্বাসীরা তাদের ভাল কাজ অনুযায়ী নিজেদের ভেতর আলো খুঁজে পাবে। কারো কারো  আলো হবে পাহাড়ের সমান। কারো কারো আলো ছড়াবে একটি তালগাছের দূরত্ব পর্যন্ত। এভাবে করে একদল লোক থাকবে যাদের শুধু পায়ের আঙ্গুলে একটুখানি আলো থাকবে । একবার জলে আবার নিভে যায়।যার যার আমল অনুযায়ীএবং সেই আলোর সাহায্যে সিরাত পার হবে। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করা ভালো মানুষের সাথে মানুষের বন্ধুত্ব স্থাপন করার ব্যাপারে টি বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে।

যে পাহাড় সমান আলো ছড়াবে ।সে কি তার সঙ্গীদের পথ দেখিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। যে ব্যক্তি সেদিন একেবারে অল্প আলো পাবে এবং অত্যন্ত কষ্ট করে রাত পর্যন্ত পৌঁছাবে সে দুনিয়াতে এমন কারো সঙ্গী হয়নি এমন কারো সাথে বন্ধুত্ব করে নিন যে কঠিন সেই দিনে চার পাশে আলো ছড়িয়ে দেবে। তাই আমাদের দিনে ভালো মানুষের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করার ব্যাপারে বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে ।

প্রতিটি মানুষ তার আলো অনুযায়ী  সিরাতের দিকে আগাচ্ছে কিন্তু একদল মানুষ দেখল তাদের তো কোন আলো নেই। তাদের চারপাশে ঘন অন্ধকার ওই দূরে তারা দেখতে পায় কিছু মানুষ তাদের নিজেদের আলো নিয়ে ছুটে চলছে সিরাতের পানে। কিন্তু এত অন্ধকার পাড়ি দিয়ে তাদের পক্ষে ওই মুমিনদের পিছু নেয়া সম্ভব না । এরাই হচ্ছে মোনাফেক যারা এতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাসী  দের সাথে ছিল, যারা ভেবেছিল তারা আল্লাহকে ধোকা দিতে পেরেছে। অবশেষে আল্লাহ তাদের পাকড়াও করবেন।

“যেদিন তোমরা ঈমানদার নারী ও পুরুষদের দেখবে, তাদের নূর তাদের সামনে ও ডান দিকে দৌড়াচ্ছে । তাদের বলা হবে, আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ। জান্নাত সমূহ থাকবে পাদদেশ দিয়ে ঝর্ণা ধারা সমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। যেখানে তারা চিরকাল থাকবে । এটাই বড় সফলতা।সেদিন মুনাফিক নারী পুরুষের অবস্থা হবে এই যে তারা মুমিনদের বলবে  আমাদের প্রতি একটু লক্ষ করো যাতে তোমাদের নুর থেকে আমরা কিছু উপকৃত হতে পারি। কিন্তু তাদের বলা হবে পেছনে চলে যাও। অন্য কোথাও নিজেদের তালাশ করো। অতঃপর একটি প্রাচীর দিয়ে তাদের মাঝে আড়াল করে দেয়া হবে। তাতে একটি দরজা থাকবে। সে দরজার ভেতরে থাকবে আর বাহিরে থাকবে আজাব। “

সিরাতে পৌঁছে একেক ব্যক্তি একই গতিতে তা পার হবে। কেউ পার হয়ে যাবে চোখের পলকে কেউ কেউ ধীর গতিতে। কেউ কেউ ঝড়োহাওয়ার গতিতে কেউ কেউ দ্রুত ঘোড়া উটের গতিতে কারো গায়ে আখড়া গুলো  আঁচড় লাগবে। আবার কেউ কেউ পার হয়ে যাবে সম্পূর্ন নিরাপদে। সিরাতে পার হয়ে যাওয়া শেষ মানুষটি পার হবে টেনেহিঁচড়ে, অত্যন্ত কষ্ট করে- আল্লাহ যেন আমাদের সকলকে নিরাপদে সিরাত পার হওয়ার তৌফিক দান করেন।

সিরাতে পার হয়ে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্বাসিদের সাথে। জান্নাতে দ্বারপ্রান্তে এসে ফিরে দেখছেন আপনার যাত্রা। যে মৃত্যুকে একসময় মনে হতো জীবনের শেষ, সেই মৃত্যু এখন মনে হচ্ছে এক দীর্ঘ যাত্রার প্রথম অধ্যায় মাত্র। মৃত্যুর ঘাট পার হয়ে কবরের জীবন পুনরুজ্জ্বীবিত হাশরের ময়দানে দাঁড়িয়ে থেকে হিসাবের পর্ব পার করে। মিজানের অধ্যায় পার করে পুলসিরাত পার করে আজ আপনি এখানে। দুনিয়ার জীবনকে তখন মনে হচ্ছে কত ক্ষুদ্র কত নগণ্য কিন্তু এই শেষ প্রান্তে এসেও দুনিয়ার জীবন আপনার পিছু ছাড়লো না। জান্নাতের দ্বারপ্রান্তে এসে এখনো একটি ধাপ বাকি রয়ে গেল। সিরাতে পার হয়ে আসা প্রত্যেক বিশ্বাসী ব্যক্তি  একই প্রান্তরে । এখানে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের উপর কোন জুলুম করে থাকলে বা তার কোন হক নষ্ট করে থাকলে এখানে এসেছে তার হিসাব চুকিয়ে দেয়া হবে। যে ব্যক্তি আরেকজন বান্দর হক নষ্ট করেছে তার আমলনামা থেকে ভালো কাজ নিয়ে অপর ব্যক্তির আমলনামায় দিয়ে দেয়া হবে। হয়ত এ কারণেই গীবত আমাদের দিনে এত ভয়ঙ্কর একটি পাপ।

ভেবে দেখুন পরকালের যাত্রা এতদূর পথ পাড়ি দিয়ে জান্নাতের দ্বারপ্রান্তে এসে আপনি আপনার নেক আমলগুলো দিয়ে দিচ্ছেন। কারণ আপনি কারো ব্যাপারে গীবত করেছিলেন কারো ব্যাপারে মিথ্যা খবর জড়িয়েছিলেন। আল্লাহ না করুক যদি সেই গীবতের পরিমাণ যদি সেই হক নষ্ট করার পরিমাণ এত বেশি হয় আপনার নেক আমলগুলোকে ছাড়িয়ে যায় তাহলে জান্নাতের দ্বারপ্রান্ত থেকে সে সিরাতে পার হয়ে যাওয়া সত্বেও আপনাকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে এবং সে সিরাতে উপরে রয়েছে শুধু আজাব। সেই আজাব কত ভয়ানক তা হয়তো আমরা কিছুটা জানি। কিন্তু সেই আজাদ এর থেকেও বড় আযাব হবে সেই মুহূর্তে জান্নাতের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে দেয়া ব্যক্তির যা তাকে তার অন্তর থেকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে।

একে অপরের হক মেটানোর পর প্রতিটি বান্দা এগিয়ে যাবে তার অন্তিম গন্তব্যের দিকে। একপাশে দুঃস্বপ্নের চেয়েও ভয়ংকর জাহান্নামের জগত অন্যপাশে নির্মল প্রশান্তির প্রশান্তির জগত জান্নাত।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close