ইসলামিকশ্রেষ্ঠ মানুষ

লুত (আ) এর জীবনী এবং সাদ্দুম ও অমর বাসীদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনা ।। শ্রেষ্ঠ মানুষ ৯তম পর্ব ।।

ইব্রাহিম (আ) যখন বাবেল শহর ছেড়ে হিজরত করছিলেন তখন তার সাথে ছিল তার স্ত্রী  সারা এবং তার ভাই হারানের পত্র লুত (আ) ।যাত্রার কোন এক পর্যায়ে আল্লাহ লুত (আ)  কে নবী হিসাবে বেছে নিলেন। তাকে আদেশ করলেন ভিন্ন এক শহরে যাবার জন্য। ইব্রাহিম (আ) যখন সাম অঞ্চলে এক আল্লাহর বাণী প্রচার করেছিলেন ।আল্লাহ লুত (আ)  কে আদেশ করেছিলেন সাদ্দুম ও অমরা অঞ্চলে যেতে। এই আদেশের মাধ্যমে লুত (আ) আল্লাহর নবী হিসাবে নির্ধারিত হন। বর্তমান আর্কিওলজিক্যাল রিসার্চ অনুসারে সাদ্দুম ও অমরা শহর অবস্থিত ছিল বর্তমান সময়ের জর্দানের মৃত সাগরের আশেপাশে। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই অঞ্চলের মানুষগুলোর কাজকর্ম ছিল অত্যন্ত  কুৎসিত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সাদ্দুম ও অমরা অঞ্চলে মানুষের প্রতি লুত (আ) এর বক্তব্য বর্ণনা করে বলেন।

“তোমরাই তো পৌরুষে উপগত হচ্ছ, তোমরাই তো রাহাজানি করে থাক, এবং তোমরাই তো নিজেদের মজলিসে প্রকাশ্যে ঘৃণ্য কাজ করে থাকো।”

তোমরা কি করে পুরুষেরা পুরুষদের সাথে উপগত হচ্ছ আর তোমরা মুসাফিরদের সাথে ডাকাতি করো এবং নিজেদের মজলিসে প্রকাশ্যে ঘৃণ্য কাজ করো। এই আয়াত থেকে  সাদ্দুম ও অমরা শহরের প্রচলিত কাজের কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। যা স্পষ্টভাবেই আল্লাহর দৃষ্টিতেই নিকৃষ্ট কাজ। এর মধ্যে প্রধান যে কাজটি উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো পুরুষের সাথে পুরুষের দৈহিক মিলন এবং পায়ুপথে সঙ্গম। এই আয়াত দ্বারা এটাও বুঝা যায় যে তারা এই কাজটি প্রকাশ্যে তাদের মজলিসে করত। এবং এর আগের আয়াতে লুত (আ)  এর বক্তব্য বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন।

“ আর স্মরণ করুন লুতের কথা যখন তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন তোমরা নিঃসন্দেহে এমন অশ্লীল কাজ করছ যা তোমাদের আগে সৃষ্টিকুলের কেউ করেনি।”

অর্থাৎ তারা যে শুধুই এ কাজে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করেছে তাই নয়। বরং তারাই মানব ইতিহাসের প্রথম যারা এমন কাজে লিপ্ত হয়েছে। কিন্তু কেবলমাত্র একারণেই আল্লাহ তাদের উপর ক্ষুব্দ হননি। কেননা তারা আরও নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজে জড়িত ছিল। সাদ্দুম ও অমরা ছিল একটি উন্নত শহর এখানে বাণিজ্যের কারণে বহু ব্যবসায়ী ও মুসাফিরদের আনাগোনা ছিল। অথচ সাদ্দুম ও অমরার  স্থানীয় লোকেরা এই মুসাফিরদের কাজ থেকে ডাকাতি করত এবং তাদের মধ্যে থেকে পুরুষদের বাছাই করে পায়ুপথে ধর্ষণ করতো। হিব্রু বাইবেলে তাদের অপকর্মের কিছু উদাহরণ রয়েছে। যা পবিত্র কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক নয় অথচ সেই তথ্যগুলো সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এবং সেখানে উল্লেখ করা রয়েছে

সাদ্দুম ও অমরার মানুষদের কাছে দান করা মানা ছিল তাদের নীতি ছিল যা আমার তা আমার আর যা তোমার তা তোমার। এমনকি আর্থিক সংকটে থাকা মানুষদের সাহায্য করা তাদের দৃষ্টিতে এমন বড় অন্যায় কাজ ছিল ।কেউ কাউকে কোন কিছু দান করেছে এমনটা শোনা গেলে সে কঠিন শাস্তি পেত।

এই জাতির ধ্বংসের একটি বড় কারণ ছিল তারা শুধু নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত ছিল না বরং তারা এমন সব কাজে লিপ্ত ছিল যা মানব ইতিহাসে এর আগে কখনো করা হয়নি। তাই সমকামিতা এবং একই লিঙ্গের ব্যক্তির সাথে দৈহিক মিলনের বিষয়টি বর্তমান সময়ে পবিত্র কোরআন এবং হাদিসের আলোকে কিভাবে দেখা প্রয়োজন তা নিয়ে আলোচনা করাটা অত্যন্ত জরুরী। এবং এই গল্পের শেষ এই আমরা এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

সাদ্দুমের  গল্পে ফেরা যাক, এইরকম একটি  আধুনিক ও শক্তিশালী রাষ্ট্র এসে যখন লুত (আ)  ইসলামের বাণী প্রচার করতে লাগলেন তখন তারা তার কথায় কান দিলো না। বরং তিনি যখন তাদের আল্লাহর পথে ফিরে আসার আহ্বান জানাতে লাগলেন ।তখন তারা লুত (আ)  কে হুমকি দিয়ে বলল তুমি যদি তোমার এই মৌলবাদী প্রচার-প্রচারণা বন্দ না করো তাহলে তোমাকে আমরা এই দেশ থেকে বিতাড়িত করবো। অবশেষে তারা লুত (আ) কে বলল  তুমি যে এত আল্লাহর শাস্তির কথা বলছ পারলে তুমি আল্লাহর শাস্তি নিয়ে আসো দেখি তুমি আমাদের কি করতে পার। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো লুত (আ) কে শুধুমাত্র দু একজন নিকৃষ্ট ব্যক্তি এমনভাবে চ্যালেঞ্জ করেনি বরং গোটা জাতির প্রতিটি স্তরের মানুষের মনোভাব টাই এমন ছিল। এই পরিস্থিতিতে লুত (আ)  এর কাছে খবর আসলো শহরে নাকি অবিশ্বাস্য সুদর্শন তিনজন মুসাফির প্রবেশ করেছে।

স্থানীয় লোকেরা এ খবর জানলে সর্বনাশ হয়ে যাবে ভেবে লুত (আ)  ছুটে চলেন সেই মুসাফির ব্যক্তির কাছে। এবং তাদেরকে পেয়ে তার ঘরে আমন্ত্রণ জানালেন । লুত (আ) সেই তিনজন মুসাফিরকে নিয়ে হাঁটলেন তার ঘরের পানে এবং পথে চলতে চলতে সে মেহমানদেরকে বললেন এই শহরের মানুষের মত নিকৃষ্ট মানুষ আমি আর কোথাও দেখতে পাইনি। মেহমানরা নিশ্চুপ তার পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকল।তিনি আবারও একই কথা বললেন , লুত (আ) যাচ্ছিলেন যে মুসাফির লোকেরা সাদ্দুম ও অমরার লোকেদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা পায়। তিনি তাদের সরাসরি চলে যেতে বলছিলেন না যেন তারা মনে করে তিনি তাদের মেহমান হিসেবে আমন্ত্রিত করতে চাচ্ছিলেন না। এবং তারা যদি অন্য কারো ঘরে যেত তাহলে তারা অনেক বড় বিপদে পড়ত।তার মেহমানদের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে লুত (আ) এর ঘরের সকল মানুষ হতবাক। বিশেষ করে তার স্ত্রী যে ছিল  লুত (আ) এর বাণীর বিরুদ্ধে। সাদ্দুম ও অমরার প্রচলিত পাপাচারের পক্ষে সে লুত (আ) এর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ল এবং শহরের নেতাদের কাছে গিয়ে বলল ।তার স্বামীর ঘরে তিনজন মেহমান এসেছে যাদের রূপ ও সৌন্দর্যের কাছে সবকিছু মলিন হয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই লুত (আ) এর বাড়িতে স্থানীয় লোকেরা জড়ো হয়ে যায় এবং দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে।

লুত (আ)  আতঙ্কিত হয়ে যান এবং তাদেরকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। তিনি তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ করে বলেন।

“ তিনি বললেন হে আমার সম্প্রদায় এরা আমার কন্যা। তারা তোমাদের জন্য পবিত্র। কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আর আমার মেহমানদের ব্যাপারে আমাকে লজ্জা দিওনা। তোমাদের মধ্যে কি একজন সুবোধ ব্যক্তি ও নেই?”

লুত (আ) এতটাই অসহায় হয়ে পড়লেন যে তিনি বললেন এই যে আমার মেয়েরা আছে তোমাদের বিয়ে করার জন্য তারা তোমাদের কাছে পবিত্র ।তোমরা আল্লাহকে ভয় করো আমার মেহমানদের বিষয়ে তোমরা আমাকে লজ্জা দিওনা। তোমাদের মধ্যে কি একটা ভালো মানুষ নেই ।কিন্তু তারা বলল লুত  তুমিতো ভালো করেই জানো আমরা কি চাই। এই অবস্থায় লুত (আ) ব্যাকুল হয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন এবং তখনই তাদের মেহমানরা তাদের পরিচয় দিল।

“ তারা বলল হে লুত (আ) নিশ্চয় আমরা আপনার রবের পেরিত ফেরেশতা। তারা কখনোই আপনার কাছে পৌঁছাতে পারবে না ।”.

জিব্রাইল আলাই সালাম তার ডানা দিয়ে একটা  ঝাপটা দিলেন এবং সাথে সাথে লুত (আ) এর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সকল ব্যক্তি গুলো অন্ধ হয়ে গেল। এরপর তারা লুত (আ)   কে উদ্দেশ্য করে বলল আপনি রাতের কোন এক সময় আপনার পরিবার পরিজনদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। এবং আপনাদের মধ্য থেকে কেউ যেন পিছনে না তাকায়। শুধুমাত্র আপনার স্ত্রী ব্যতীত।

কেননা সাদ্দুম ও  অমর বাসীদের উপর এমন ভয়াবহ আজাব নাজিল হবে  কেউ যদি পিছনে তাকায় তাহলে সেও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। আল্লাহর হুকুমে লুত (আ)   রাতের আঁধারে তার পরিবার পরিজন নিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লেন। ওইদিকে সাদ্দুম ও অমরার বাসীরা দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে নিজ নিজ বাড়ি ফেরার জন্য চেষ্টা করতে লাগলো তাদের কোন ধারনাই ছিলনা যে তাদের সাথে কি ঘটেছিল এবং তাদের সাথে কী ঘটতে যাচ্ছে। রাত ঘুরিয়ে ভোর হলো এবং সূর্যের আলো সাদ্দুম ও  অমরা শহর স্পর্শ না করতেই শোনা গেল এক ভয়ংকর চিৎকার।

এমন এক ভয়ঙ্কর চিৎকার যা শোনার সাথে সাথেই প্রবলে ভয়ংকর আতংক সৃষ্টি হয়। এবং পুরো শরীর জুড়ে যন্ত্রণা আরম্ভ হয়। যে কোন সভ্যতা কে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য এই চিৎকার যথেষ্ট।

বর্তমান সময়ে লুত (আ) এর ঘটনাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে সমকামিতার ব্যাপারে বোঝার জন্য এই ঘটনাটি গভীরভাবে পড়াশোনা করা জরুরি। প্রথমে যেই বিষয়টি আমাদের স্থাপন করতে হবে তা হলো এই যে আল্লাহ খুব পরিষ্কারভাবে আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন একই লিঙ্গের মানুষের সাথে দৈহিক মিলন থেকে বিরত থাকতে।

 

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close