ইসলামিকজীবন - মৃত্যু - জীবন

মীযান (জীবন – মৃত্যু – জীবন: পর্ব ৭)

—–মীযান —-

হিসাব ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি পেয়ে গেছে আরেকজন মানুষের নেয়া হয়েছে সহজ হিসাব এবং তৃতীয় দলের মানুষদের কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব নেয়া হয়েছে একদল লোক তাদের আমলনামা গুলোকে ডানহাতে আরেকদল পেল বাম হাতে।

“তারপর যখন আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হয়েছে।তার কাছ থেকে হালকা হিসাব নেয়া হবে এবং সে হাসিমুখে নিজেদের লোকের কাছে ফিরে যাবে। আর যার আমলনামা তার পিছন দিক  দিয়ে দেয়া হয়েছে ।সে মৃত্যুকে ডাকবে এবং চলমান আগুনে গিয়ে পড়বে”

হিসাবে মাধ্যমে দুনিয়ার জীবনে কি কি কাজ ছিল তা জানতে পারি কিন্তু করি না এখনও জানা যায়নি সেটা জানার জন্যই এরপর সবার সামনে নিয়ে আসা হবে  মিজান।

“ কিয়ামতের দিন আমি যথাযথ ওজন করার দাঁড়িপাল্লা ধার্য করব ফলে কোন ব্যক্তির প্রতি সামান্যতম জুলুম হবে না। যার তিল পরিমাণ কোন কর্ম থাকবে তাও আমি সামনে আনবো এবং হিসাব করার জন্য আমি যথেষ্ট”

মীযান এর বাংলা অর্থ দাঁড়িপাল্লা। দাঁড়িপাল্লা কি তা আমরা সবাই জানি ।এর দুই দিকে দুটো পাল্লা থাকে যা দিয়ে আমরা ওজন মেপে  থাকি।কেয়ামতের দিবসের মীযান এই কাজটি করবে কিন্তু বলাই বাহুল্য সেই মীযান কল্পনা করা আমাদের জন্য সম্ভব নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কেয়ামতের দিন মিজান আনা হবে। সেখানে যদি গোটা আসমান আর জমিনকে ওজন করা হয়, তা করা যাবে। অতএব আমরা এই মিজান কল্পনা করতে পারিনা। শুধু এতোটুকুই জানি এখানে ছোট-বড় সব ধরনের আমল কে ওজন করা হবে ।

“তারপর যে অতি অল্প পরিমাণ ভালো কাজ করবে সে তা দেখে নেবে ।এবং যে অতি অল্প পরিমাণ খারাপ কাজ করবে সে তা দেখে নেবে।”

যে সকল আমল ঈমানের সাথে শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশি করার উদ্দেশ্যে তার প্রেরিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশনা মোতাবেক করা হয়েছিল। সে সকল আমল ক্ষুদ্র হলেও মিজানে তাদের  বার হবে অনেক। যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে খুশি করার জন্য হয়ে থাকে বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিখিয়ে দেয়ার পদ্ধতিতে না করা হয়ে থাকে। সেই কাজ সংখ্যায় যতই হোক না কেন মিজানে তার কোন মূল্যই থাকবেনা ।

বোখারির হাদিসে বর্ণিত আছে আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন দুটি কথা আছে যা অত্যন্ত হালকা অত্যন্ত হালকা কিন্তু  মিজানে অত্যন্ত ভারী এবং আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয।কথা দুটি হচ্ছে সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি এবং সুবহানাল্লাহিল আজিম এক হাদীসে বর্ণিত আছে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন আল্লাহ আমার উম্মতের একজন লোক সবার সামনে নিয়ে আসবেন। তার আমলনামা বিছিয়ে দেয়া হবে। যার প্রত্যেকটি যতদূর চোখ যায় ততদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকবে ।

তুমি কি কোন কিছুকে অস্বীকার করো আমার আমল সংরক্ষক ফেরেশতা কি তোমার প্রতি কোন অন্যায় করেছে। লোকটি বলবে না আমার প্রতিপালক। আল্লাহ বলবেন তোমার কি পেশ করার মত কোন অজুহাত বাকি আছে। লোকটি হতবাক হয়ে বলবে না আমার প্রতিপালক।আল্লাহ বলবেন অবশ্যই আমাদের কাছে তোমার একটি নেকি আছে। আজ তোমার প্রতি কোন অবিচার করা হবে না। এরপর এক টুকরো কাগজ বের করা হবে যাতে লেখা থাকবে আসাদুল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহু অসাধু আন্না মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।

আল্লাহ মিজান আনতে আদেশ করবেন। লোকটি বলবে হে আমার প্রতিপালক এতগুলি বড় বড় আমলনামার কাছে এই ছোট্ট কাগজের ওজন আর কি হবে। আল্লাহ বলবেন তোমার প্রতি অবিচার করা হবে না অতঃপর আমলনামা গুলোকে এক পাল্লায় এবং এই ছোট্ট কাগজটিকে অন্য পাল্লায় চড়ানো হবে। দেখা যাবে আমলনামা গুলোর ওজন হালকা এবং ছোট সেই কাগজটির ওজন ভারি হয়ে গেছে।

এছাড়াও বিভিন্ন হাদীসে নিয়মিত জিকির-আজকারের কথা উল্লেখ আছে যেগুলো রজন মিজানের পাল্লায় ভারী হবে। আমরা অনেক সময় সংখ্যায় বেশী আমল করার দিকে নজর দেই কিন্তু আন্তরিকতার সাথে আমল করার ব্যাপারে উদাস  থাকি। অথচ মিজানের বর্ণনা কোন সন্দেহ থাকে না যে আমাদের দিনে আন্তরিকতার উপর অনেক বেশি জোর দেয়া হয়েছে।আবু দাউদ গ্রন্থে আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন এমন কিছুই নেই যা মিজানে সুন্দর চরিত্রের চেয়ে বেশি ভারী হবে।

ভালো কাজ বলতেই আমরা চিন্তা করি নফল ইবাদতের কথা কোরআন পড়া সাদকা অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মনে করিয়ে দিলেন সুন্দর চরিত্রের গুরুত্ব কত বেশি। আমরা সাধারণত ইবাদত বলতে যা বুঝি তা করলে সেগুলো মিজানের পাল্লা ভারী করবেন। কিন্তু এর পাশাপাশি আমরা যেন সুন্দর চরিত্র বজায় রাখার দিকে নজর দেই। বিশেষ করে ইন্টারনেটের এই যুগে অনেক কিছুই আমরা অনলাইনে দেখি যার সাথে আমরা একমত নই যা আমাদের  বিরক্ত করে হয়তো রাগিয়ে দেয় ।

তখন হয়তো খুব সহজেই আমরা রাগের মাথায় একটা খারাপ কথা বলে ফেলি। অনলাইন ছাড়াও দৈনন্দিন জীবনে ঘরে বাইরে রাস্তাঘাটে দিন দিন মানুষের ধৈর্য কমে যাচ্ছে। একজন আরেকজনকে ওভারটেক করছে, একটা গাড়ি আরেকটাকে ধাক্কা দিচ্ছে , বাসের কন্টাকটার তিন-চারবার ভাড়া চাচ্ছে, অফিসে পলিটিক্স চলছে , ঘরে ঝগড়া চলছে , আত্মীয়-স্বজন একজন আরেকজনকে নিয়ে মন্তব্য করছে এসব কিছুর মধ্যে সুন্দর আচরণ ধরে রাখাটা যেন এক ধরনের যুদ্ধ।

তাই আমরা যেন মনে রাখি এই যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পুরস্কার কিন্তু অনেক বড়। আমাদের মনে হতে পারে রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়ার নফল রোজা রাখা বা বেশি বেশি সাদাকা করাকে উল্লেখ না করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্দর আচরণ কে কেন এত গুরুত্ব দিলেন। এর একটি ব্যাখ্যা হচ্ছে যে কষ্ট করে এত এত নফল এবাদত করে কিন্তু তার আচরণ ভালো না সে তার খারাপ আচরণের মাধ্যমে তার ভালো কাজগুলোকে কেয়ামতের দিবসে হারিয়ে ফেলবে। সে হয়তো কারো ব্যাপারে গীবত করল তখন যার ব্যাপারে করেছে তার তাহাজ্জুদের নেকী নিয়ে যাবে । আরেক ব্যক্তিকে গালমন্দ করল সে ব্যক্তি তার তাহাজ্জুদের নেকী নিয়ে যাবে ।যে ব্যক্তির আচরণ সুন্দর তার ভাল কাজ অল্প হলেও কেয়ামতের দিবসে সেই ভালো কাজ তার কাছে রয়ে যায় এবং সেই ভালো কাজের মাধ্যমে সে পার পেয়ে যায়। আল্লাহ আমাদেরকে অন্যের হক নষ্ট করা থেকে হেফাজত করুন।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন যে বাবা মা সন্তান হারানোর পর সবর করে তার সেই সবর মিজানের পাল্লা ভারী করবে। যে ব্যক্তি জানাজায় শরিক হলো তার জন্য ওহুদ পাহাড় পরিমাণ নেকি মিজানের পাল্লায় যোগ করা হবে। যারা নিয়মিত কোরআন পাঠ করেছে তাদের জন্য স্বয়ং কোরআন শাফায়াত করবে। কোরআন পাঠ করার সময় প্রতিটি উচ্চারিত অক্ষর এর জন্য দশটি নেকী জমা হবে অর্থাৎ আমরা যদি শুধুমাত্র সূরা ইখলাস তেলাওয়াত করি আমাদের পাল্লায় 400 টিরও বেশি নেকি জমা হবে সুবহানাল্লাহ । তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত প্রতিদিন কোরআন পাঠ করা। একটি লাইন হলেও পাঠ করা কিন্তু প্রতিদিন করা ।

অনেকে বলেন কোরআন তো শুধু পড়ে গেলেই হবে না  কোরআন তো আল্লাহ পাঠিয়েছেন বোঝার জন্য। এই কথাটি 100 ভাগ সত্য কিন্তু অনেকে আবার কোরআন পরা বোঝার দিকে জোর দিতে গিয়ে কোরআন তেলাওয়াতের মর্যাদা ছোট করে দেখতে চান এবং সেটা অবশ্যই একটি বড় ধরনের ভুল । বোঝা সারা জীবনের একটি যাত্রা এই অভিযান চলবে নিয়মিত কোরআন পাঠ করার পাশাপাশি।

কোরআন তিলাওয়াত করার তাৎপর্য শুধু অক্ষরে দশটি করে নেকি নয়। আমরা যখন কোরআন তেলাওয়াত করি তখনই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা যা বলেছেন আমিও একই কথা উচ্চারণ করছি এটা কি শিহরিত হওয়ার মতো বিষয় না। উদাহরণ স্বরূপ চিন্তা করুন যখন কোন এক বিখ্যাত খেলোয়াড় খেলায় বিজয়ী হয়ে তার জার্সিটা ছুড়ে মারে ভক্তদের কাছে ,যে ভক্ত সেই জার্সিটা ধরতে পারে তার অবস্থা কেমন হয়। সে হয়তো কান্নায় ভেঙে পড়ে, সে হয়তো সারা জীবন তার রুমে টাঙ্গিয়ে রাখবে। যে সে খেলাটা দেখে না যে সে খেলাটা বোঝেনা সে ব্যক্তি হয়তো অবাক হবে।

ভাববে  আরেকজন মানুষের গেঞ্জি পেয়ে একজন মানুষ এত খুশি হচ্ছে কেন? কিন্তু যে সে খেলোয়াড় তাকে চিনে, সেই জানে এই জার্সি শুধু এক টুকরো কাপড় নয় তার কাছে এর মাহাত্ম্য অনেক, অনেক বেশি। যে আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। তিনিই আকাশমণ্ডলী এই গ্রহ নক্ষত্র এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। যিনি আমি যা যা ভালোবাসি যাকে যাকে ভালোবাসি সব কিছুই সৃষ্টি করেছেন । তিনি যে কথাগুলো আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন কথাগুলো ত্রুটিহীন। যে কথাগুলো বিস্ময়কর সেই কথাগুলো আমার মত ক্ষুদ্র এক বান্দা তার অগণিত পাপের জর্জরিত যিহোবা দিয়ে উচ্চারণ করতে পারছে আমার কি উৎফুল্ল হওয়ার কথা না ।

একটি আয়াত আমি উচ্চারণ করলাম তার মানে বোঝার আগেই আমি সেটা উচ্চারণ করার মর্যাদা পেয়েছি। সেই মর্যাদা পেয়ে কি আমার অন্তর কৃতজ্ঞতায় কেঁপে ওঠার কথা না। বাস্তবে কোরআন তিলাওয়াত করা মুখস্ত করা এবং তার উপর আমল করা প্রত্যেকটি ভালো কাজগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত এবং এর একটি ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। প্রত্যেকটি মিজানের পাল্লা ভারী করবে হোক তা রোজা, যাকাত , হজ , নফল ইবাদত , জিকির আজগার ইত্যাদি ।

কোন ভালো কাজটি আমাদের জন্য কঠিন সেই দিবসে কল্যাণ বয়ে আনবে আমরা জানি না। যে হজ করে হয়তো দারুণ তৃপ্তি বোধ করছি। হয়তো সেই আল্লাহ কবুল করেন নি। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুক।কেননা সেই টাকায় ছিল ঘুষ আর সুদের অংশ। কিয়ামতের দিন মিজান এ দেখা গেল সেই হজের কোন ওজন নেই।

অন্যদিকে একদিন হয়ত আর্থিক সংকটে পড়া এক আত্মীয় মর্যাদাবোধের কারণে মুখ ফুটে টাকা-পয়সা চাইতে পারছিলেন না। তার চাহিদা অনুমান করে তাকে কিছু টাকা দিয়েছিলাম সেই টাকা দিয়ে হয়ত তার সংকট কেটে গেল। কেটে যাওয়ার পর সে হয়তো আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে হয়তো সে তার সন্তানদের সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তুলল। তারা একজন সন্তান কোরআনের শিক্ষক হয়ে গেল। হাজার হাজার মানুষকে কোরআনের শিক্ষা দিতে লাগলো। কেয়ামতের দিন দেখা গেল হাজারখানেক টাকার বিপরীতে আসমান পরিমাণ ভালো কাজ লেখা হয়ে গেছে ।

আমরা যেন প্রত্যেকেই আন্তরিকতাপূর্ণ ছোট ছোট ভালো কাজ দিয়ে আমাদের জীবনকে সাজাতে পারি। আর যেসব ভুল হয়ে গেছে তার জন্য ক্ষমা চেয়ে পাপের পাল্লা হালকা করতে পারি । আল্লাহ আমাদের সবাইকে তৌফিক দিন।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close