ইসলামিকজীবন - মৃত্যু - জীবন

জাহান্নাম (জীবন – মৃত্যু – জীবন, পর্ব ৯)

“যারা  বলে, হে আমাদের রব জাহান্নামের আজাব থেকে আমাদের বাঁচান। তারা আজাব তো সর্বনাশা  বসবাস ও অবস্থান স্থল হিসেবে তা কত নিকৃষ্ট জায়গা। “

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রাসূল। নিশ্চয় আল্লাহ সত্য তার ফেরেশতারা সত্য তার রাসুল সত্য  তার কিতাব সত্য কেয়ামত সত্য কদর সত্য জান্নাত সত্য জাহান্নাম সত্য।

জাহান্নাম সেই নাম যা  থেকে আমরা যতটুকু সম্ভব দূরে থাকতে চাই। যে নাম শুনলেই আমরা তা মস্তিষ্ক থেকে দূরে ঠেলে দিতে চাই। জাহান্নামি হওয়া তো দূরের কথা আমরা এই নিয়ে চিন্তাও করতে চাইনা। কিন্তু জাহান্নাম সত্য এবং আল্লাহ আমাদেরকে এর ব্যাপারে সতর্ক করেছেন । আপনারা নিজের সন্তান যদি আগুনের দিকে হাত বাড়ায় আপনি বলবেন না । তাকে আগুনের মতো ভয়াবহ বিষয়ের কথা বলে লাভ কি ছোট মানুষ এসব কথা শুনলে ভয় পাবে। আপনি জানেন সে আগুনে হাত দিলে তার হাতটা পড়ে যাবে । তাই আপনি তার প্রতি ভালোবাসার কারণে তাকে আগুনের ব্যাপারে সতর্ক করে দেবেন।

পবিত্র কোরআনে যে বিষয়গুলো বারবার এসেছে তার মধ্যে একটি হলো জাহান্নামের ব্যাপারে সতর্কতা। কারণ আল্লাহ জানেন এই বিষয়ে মানুষ অনেক বেশি খামখেয়ালী। আল্লাহর রহমত অসিম একথা ভেবে অগণিত বান্দা জাহান্নামকে ভুলে সেই ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে নিজেদের ঠেলে দেবে। আল্লাহ জাহান্নাম কে সৃষ্টি করেছেন অবিশ্বাসী মুনাফেকদের জন্য এবং এমন বিশ্বাসিদের জন্য জন্য যারা অনেক বেশি পাপ অর্জন করেছে।

জাহান্নামের আছে এক অতসহনিহ ক্ষুধা। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন একদিন আল্লাহ জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করবেন তোমার পেট ভরেছে। জাহান্নাম বলবে আরো কিছু আছে কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন জাহান্নামের প্রান্ত থেকে এর ভেতর একটি পাথর ফেলে দিলে সেই পাথর 70 বছর ধরে পড়তে থাকলেও এর তলায় গিয়ে পৌঁছবে না। জাহান্নামের আছে অনেকগুলো স্তর। যে যত নিচের স্তরে থাকবে তার শাস্তি  তত বেশি কঠিন।

সহীহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন তার চাচা আবু তালেব জাহান্নামের বাসিন্দাদের মধ্যে সবচেয়ে হালকা শাস্তি পাবেন। এই হালকা শাস্তি হলো তাকে আগুনের এক জোড়া জুতো পরিয়ে দেয়া হবে। যার তাপের কারণে তার মস্তিষ্ক ফুটতে থাকবে। আল্লাহ যেন আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রেহাই দেন। আল্লাহ যেন আমাদের পরিবার পরিজনদের কে জাহান্নাম থেকে রেহাই দেন।

জাহান্নামের সবচেয়ে নিম্ন স্তরে জায়গা হবে মুনাফিকদের এবং তারা ভোগ করবে সবচেয়ে ভয়াবহ শাস্তি গুলো। জাহান্নামের বাতাস হবে অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং জাহান্নামের পানি হবে ফুটন্ত পানির মতো গরম।সেখানে ছায়া থাকবে শুধুমাত্র একটি গভীর দুয়ার ভেতরে যেখানে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়াই দুষ্কর। জাহান্নামের আগুনের তাপ হবে পৃথিবীর আগুনের চেয়ে 70 গুণ বেশি।যে পৃথিবীর  আগুন এক মুহূর্তের জন্য আমাদের শরীর সইতে পারে না। আমরা কি করে জাহান্নামের আগুন সহ্য করার কথা ভাবতে পারি। জাহান্নামীদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তা’আলা বলেন।

“ অতঃপর তোমরা আস্বাদ গ্রহণ করো। আমি তো তোমাদের  আজাবই শুধু বৃদ্ধি করব”

জাহান্নামে প্রতিনিয়ত শাস্তির বাড়তে থাকবে প্রতিদিন। যে শাস্তি দেয়া হবে তার আগের দিনের চেয়ে বেশি হবে অর্থাৎ এই শাস্তিতে কারো অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একবার ভেবে দেখুন এই ভাবেই জাহান্নামের জীবন চলতে থাকবে 100 বছর নয় 1 হাজার বছর নয় বরং অনন্তকালের জন্য। কোটি কোটি বছর পার হয়ে যাবার পরেও শাস্তির পরিমাণ প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে।

আল্লাহ যেন আমাদেরকে রেহাই দেন। এমন ভয়াবহ শাস্তির কথা ভাবলে আমাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে মানুষ পাপ করেছে 70-80 বছর তাহলে তার শাস্তি অনন্তকালের জন্য কেন। এর কারণ হচ্ছে তার জীবন শেষ হয়েছে আল্লাহর হুকুমে তাকে যদি অনন্তকাল বেঁচে থাকার সুযোগ দেয়া হতো সে অনন্তকাল আল্লাহর অমান্য করতো।অন্যের হক নষ্ট করে যেতে অনন্তকাল অবিচার করতো।

আল্লাহ সূরা নাবাতে বলেন। এটাই উপযুক্ত প্রতিফল এটাই উপযুক্ত শাস্তি। এই শাস্তির বর্ণনা শুনে মনে হতে পারে শাস্তিটা কি বড় বেশি  কঠিন নয়। কিন্তু আল্লাহ হচ্ছেন আলিম তিনি সব জানেন। তিনি সবচেয়ে বিজ্ঞ।যে শাস্তির বর্ণনা করা হয়েছে জাহান্নামীদের জন্য সেটাই উপযুক্ত শাস্তি । তাদের যদি এর চেয়ে অনু পরিমাণ কম শাস্তিপ্রাপ্ত হত আল্লাহ তাদেরকে ততটুকুই শাস্তি দিত। আল্লাহ যেন আমাদের সকল প্রকার শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে রাখেন এবং আমাদেরকে হিসাবে ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দেন।

ম্যাডামের বাসিন্দাদের দেহ হবে আকারে অনেক বড় তাদের চামড়ার পুরুত্ব হবে বেয়াল্লিশ জিরা । এবং এক জিরা সমান তিন ফিট ।অর্থাৎ তাদের চামড়া হবে 120 ফিট পুরুত্ব এবং তাদের শরীর গুলো হবে  উহুদ পাহাড়ের মত প্রকাণ্ড। এত বড় শরীরের কারণ হচ্ছে তারা যেন তাদের শাস্তি গুলো আরো প্রবলভাবে অনুভব করতে পারে। জাহান্নামীদের খাবার হবে দরিয়া যা না কোন ক্ষুধা মেটাবে না কোন পুষ্টি দেবে। এছাড়া জাহান্নামে দের জন্য থাকবে  যাক্কুম নামক গাছের ফল। যা খাওয়ার পর গলিত পিতলের মতো তাদের নাড়িভুঁড়ি পুড়িয়ে দিবে।এবং তাদের পানিও হবে হামিম যা হচ্ছে ফুটন্ত পানি। যা পান করার পর তাদের তৃষ্ণা কমবে না বরং বৃদ্ধি পাবে। এবং ঊসসাক যা হচ্ছে জাহান্নামীদের পোড়া মাংস থেকে বের হওয়া তরল বস্তু ।আল্লাহ আমাদের উপর রহম করুন আল্লাহ আমাদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন।

যারা দুনিয়াতে মদ্যপান করেছে তাদেরকে জাহান্নামে পান করানো হবে  জাহান্নামীদের শরীর থেকে বেরিয়ে আসা পোচ এবং যামের মিশ্রণ। আমাদের মধ্যে যারা মধ্যপান করেছে তারা যেন প্রত্যেকে তা থেকে তওবা করে ফিরে আসতে  পারি।এসব খাদ্য এবং পানীয় যে এতটা কষ্টদায়ক হওয়া সত্বেও জাহান্নামীরা এগুলো খাবে এবং পান করবে। তাহলে ভেবে দেখুন তাদের অবস্থা কতটা ভয়াবহ হবে। জাহান্নামীদের কাপড় হবে আগুনের তৈরী এবং গলিত তামার তৈরি। মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসে এসেছে আল্লাহ জাহান্নামের সবচেয়ে কম শাস্তি পাওয়া ব্যক্তি কে উদ্দেশ্য করে বলবে। তোমার কাছে যদি গোটা পৃথিবীর সমান ধন-সম্পদ থাকতো তুমি কি জাহান্নাম থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তা দিয়ে দিতে। সে বলবে হে, আল্লাহ তাকে বলবেন আমি তো তোমার কাছ থেকে এর চেয়ে আরও অনেক কম কিছু চেয়েছিলাম। আজকে আমরা  পৃথিবী ভর্তি সম্পদের জন্য নয় বরং অল্প কিছু টাকা পয়সার জন্য আমাদের দিন কে ভুলে যাই। আল্লাহ যেন আমাদের হেফাজত করেন ।

যারা এক আল্লাহকে বিশ্বাস করেছে তাঁর সাথে শিরিক করেনি। তারা এক পর্যায়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। প্রত্যেক ব্যক্তি যার  পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়নি সেই পাপের জন্য সাজা পাবে। কোন কোন পাপ আল্লাহ সরাসরি ক্ষমা করে দেন আবার কোন কোন পাপের শাস্তি আমাদের পৃথিবীতেই পেতে হয় এবং সেটাই হচ্ছে সবচেয়ে হালকা শাস্তি। যদিও দুনিয়ার জীবনে তা আমাদের কাছে অসহনীয় মনে হয়। যাদের পাপ এত বেশি যে আল্লাহর মাগফিরাত এবং পৃথিবীর শাস্তি দিয়ে সেগুলো মুছে যায়নি  তারা কবরের আযাব পাবে

কবরের আজাবের মাধ্যমেও যাদের সমস্ত পাপ মুছে যায়নি তারা জাহান্নামের  আজাব পাবে। এবং সেখানে কতদিন তাদের থাকতে হবে তা নির্ভর করবে তাদের পাপের উপর। কিন্তু নিঃসন্দেহে জাহান্নাম এমন একটি জায়গা যেখানে এক মিনিটের জন্যও আমাদের পক্ষে ধাকা সম্ভব নয়। সহীহ মুসলিমের হাদিসে বর্ণিত আছে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জাহান্নামীদের এমন একজন ব্যক্তি কে কিয়ামতের দিবস এর সামনে আনা হবে। যে দুনিয়ার জীবনে সবচেয়ে বেশী বিলাসিতা জীবন কাটিয়ে ছিল। তাকে শুধু একটিবার জাহান্নামে ডুবিয়ে আবার উঠিয়ে ফেলা হবে।

এবং তাকে প্রশ্ন করা হবে হে আদম সন্তান তুমি কি কখনো কোন আরাম উপভোগ করেছো । জীবনে কি কোন ধরনের বিলাসিতার স্বাদ পেয়েছে। সে আল্লাহর কসম খেয়ে বলবে আমি জিবনেও কোন ধরনের আরাম-আয়েশে কোন ধরনের বিলাসিতা উপভোগ করে নিন। সে ব্যক্তি কিন্তু মিথ্যা কথা বলছে না । সে এক মুহূর্তের জন্য জাহান্নামের স্বাদ পেয়ে সত্যি সত্যি তার গোটা দুনিয়ার জীবনের প্রতিটি  সুখ ভুলে গিয়েছিল। ভেবে দেখুন এই জাহান্নামে প্রবেশ করার সাথে সাথে আমরা জীবনের যত সুখ অনুভব করেছিলাম সব ভুলে যাব। সেই সুখ গুলোর জন্য কি জাহান্নাম ক্রয় করে নেয়া একজন জ্ঞানী ব্যক্তির কাজ হতে পারে না।

বাস্তবে অনেকে বলেন আমি এক আল্লাহকে বিশ্বাস করলে তো জাণ্ণাতে যাবোই। হয়তো কিছুদিন জাহান্নামে কাটাব এইটা এটা যে কত ভয়াবহ একটা ভাবনা এটা জাহান্নামের বাস্তবতা সম্পর্কে না জানলে বোঝা সম্ভব না। আমাদের প্রত্যেককে জাহান্নামের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। কোরআনে বারবার এ ব্যাপারে সতর্কবাণী এসেছে আমরা যেন এই থেকে পুরোপুরি দূরে সরে থাকার লক্ষ্য মাথায় রেখে কাজ করি। আমরা যেন প্রতিদিন এই ভয়ঙ্কর জায়গাটিকে স্মরণ করি।নিজেদের জীবনটাকে গুছিয়ে নেই এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আল্লাহ যেন আমাদের অন্তর গুলো খুলে দেন তাঁর পবিত্র সতর্কবাণী সোনার এবং বুঝার তৌফিক দেন জাহান্নাম থেকে আমাদের চিরকালের জন্য দূরে সরিয়ে নেন এবং হিসেব ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করার তৌফিক দান করেন।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close