ইসলামিকজীবন - মৃত্যু - জীবন

ক্বিয়ামত ।। যে ১০টি আলামতের পরেই কিয়ামত আসবে ! (জীবন – মৃত্যু – জীবন: পর্ব ৪)

পবিত্র কোরআনে কয়েকটি বিষয় বেশ জোর দেয়া হয়েছে ।কয়েক পৃষ্ঠা পরপরই সেই কথাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে একটি বিষয় হচ্ছে কিয়ামতের দিবস। কোরান পড়লে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে আল্লাহ এই দিনটির কথা এত ঘনঘন কেন বলেছেন। সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাই নিজেদের দিকে তাকালেই ।যে দিনটি হবে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে কঠিন দিন যেই দিনটিতে ক্ষুদ্রতম বিষয়গুলো মেপে দেখা হবে ফায়সালা করা হবে ।  সেই দিনটি নিয়ে আমরা কতটুকুই ভাবার সময় পাই বাস্তবতা হচ্ছে আমরা শেষ জামানায় বাস করছি।

কেয়ামত ঘনিয়ে আসছে। রাসুল সাঃ বিভিন্ন হাদীসে কিয়ামতের কিছু আলামত এর কথা উল্লেখ করেছেন। ওলামারা এই আলামত গুলো কে দুই ভাগে ভাগ করে,বড় এবং ছোট। ছোট আলামত অনেক রয়েছে যার মধ্যে অন্যতম হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর মৃত্যু। চৌদ্দশ বছর আগে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা যখন কিয়ামতের একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে বলা হয়েছে তখন আমরা বুঝতে পারি যে আমরা কেয়ামতের কত নিকটে চলে এসেছি। এছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম আরো অনেকগুলো চিহ্ন উল্লেখ করেছেন যার মধ্যে অন্যতম  অভাবি বেদুইনরা উঁচু অট্টালিকা বানানোর প্রতিযোগিতা করবে।

মানুষের মধ্যে পরস্পরের উপর বিশ্বাস উঠে যাবে। সুধ এমনভাবে বৃদ্ধি পাবে যে তার থেকে কোন ব্যক্তি পুরোপুরি ভাবে মুক্তি পেতে পারবে না। মদ্যপান বেড়ে যাবে, জিনা বেড়ে যাবে ,ভূমিকম্প বেড়ে যাবে ,হত্যাকাণ্ড এমনভাবে বেড়ে যাবে যে, যে ব্যক্তি হত্যা করছে আর যাকে হত্যা করছে তারা কেউই জানতে পারবেনা যে হত্যার উদ্দেশ্যটা কি? নারীরা কাপড় পরিধান করা সত্ত্বেও  বিবস্ত্র হবে। জন্তু জানোয়ারের এবং নিষ্প্রাণ বস্তু মানুষের সাথে কথা বলবে।

এবং সবচেয়ে নিম্ন স্তরের লোকেরা সমাজের নেতা হয়ে যাবে। এছাড়াও কেয়ামতের আরও বিভিন্ন ছোট আলামত আমরা বিভিন্ন হাদীসে পেয়ে থাকি। কিন্তু কিয়ামতের বড় আলামত গুলো হচ্ছে 10 টি।

মানবজাতির জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর আলামত এবং মানবজাতির জন্য সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ফিতনা হবে দাজ্জাল ! দাজ্জাল 40 দিন পৃথিবীতে রাজত্ব করবে, এর মধ্যে প্রথম দিনটি মনে হবে এক বছরের সমান। দ্বিতীয় দিনটি মনে হবে এক মাসের সমান, তৃতীয় দিনটি মনে হবে এক সপ্তাহের সমান ।এবং বাকি দিনগুলো সাধারন দিনের সমানই মনে হবে। যদিও শুনলে 40 দিন খুব বেশি সময় মনে হয় না। বাস্তবে দাজ্জাল হবে প্রতিটি মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় ফিতনা। আল্লাহ দাজ্জালকে এমন শক্তি দিবেন যে প্রকৃত ঈমানদার ছাড়া তার আহবানকে কেউ অগ্রাহ্য করতে পারবে না। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম দাজ্জালের ফিতনা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আমাদের দোয়া শিখিয়েছেন।

এবং আরো বলেছেন যে ব্যক্তি সূরা কাহফ  এর প্রথম দশটি আয়াত মুখস্ত করবেন সেটা তাকে দাজ্জালের ফেতনা থেকে রক্ষা করবে। এরপর ঈসা আলাই সাল্লাম পৃথিবীতে ফিরে আসবেন তিনি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবেন ,শিরিক ধ্বংস করবেন এবং ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করবেন। সেইসাথে তিনি দাজ্জালের সাথে যুদ্ধ করে তাকে হত্যা করবেন। এরপরে ইয়াজুজ ও মাজুজ দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়বে তারপর ঈসা আলাই সালাম তাদের বিরুদ্ধে কঠিন যুদ্ধে লিপ্ত হবেন। এবং অবশেষে তাদের ধ্বংস করবেন। এরপর ঈসা আলাই সালাম শান্তিপূর্ণ অবস্থা প্রতিষ্ঠা করবেন এবং মৃত্যুবরণ করবেন। কেয়ামতের আগে কিছু বড় ধরনের প্রাকৃতিক নিদর্শন দেখা যাবে।

সূর্য পশ্চিম দিকে উদয় হবে এবং তিনটি প্রকাণ্ড ভূমিকম্প হবে। এর একটি হবে পূর্বাঞ্চলে একটি পশ্চিমে এবং অপরটি আরব অঞ্চলে। আরেকটি প্রাকৃতিক আলামত হবে 40 দিনের জন্য গারো দোয়ায় পুরো পৃথিবী ছেড়ে যাবে। এতে বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসী নির্বিশেষে প্রত্যেক এ আক্রান্ত হবে। এই দুয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন।

“ সেই দিনের জন্য অপেক্ষা করো, যেদিন আসমান প্রতিমা নিয়ে আসবে এবং এটা মানুষকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে এটা কষ্টদায়ক সাজা “

আরেকটি বড় নিদর্শন হলো দানবের আগমন সেই  দানব টি মাটি থেকে উঠে আসবে ।তাকে আল্লাহ কথা বলার ক্ষমতা দেবেন এবং সে মুমিন ও অবিশ্বাসীদের চিহ্নিত করে দিবে। কেয়ামতের সবচেয়ে বড় আলামত হচ্ছে ইয়ামেন অঞ্চল থেকে এক প্রকাণ্ড আগুন শুরু হবে যা ছড়িয়ে পড়বে পৃথিবীজুড়ে। এই আগুন পৃথিবীতে অবশিষ্ট সকল মানুষকে একটি প্রান্তরে নিয়ে আসবে। এই শেষ নিদর্শন এরপর আরম্ভ হবে কেয়ামত।

কেয়ামত শুরু হবে হঠাৎ করে যারা কোন বিষয়ে আলোচনা করছিল সেই আলোচনা শেষ করারও সুযোগ পাবে না ।কেউ কারো পরিবার-পরিজনদের সতর্ক করার সুযোগ পাবে না। যে দুজন ব্যক্তি লেনদেন করছিল তারা তাদের লেনদেন  শেষ করারও সুযোগ পাবে না। যে ব্যক্তি ঘরে দুধ নিয়ে যাচ্ছিল সে দুধের স্বাদ পাবে না। যে ব্যক্তি মুখে খাবার তুলছিল সে মুখে খাবার দিতে পারবে না।

হঠাৎ করেই ইসরাফিল আলাই সালাম এর সিংগার শব্দে আরম্ভ হয়ে যাবে কেয়ামত। এই শব্দের সাথে সাথে আসমান এবং জমিনের সকল সৃষ্টি মৃত্যুবরণ করবে শুধু আল্লাহর নির্ধারিত কয়েকজন বান্দা ব্যতীত। গোটা আসমান জমিন বিস্ফোরিত হবে পাহাড়-পর্বত ধসে পড়বে সমুদ্র গুলো প্রজ্বলিত হবে। আমরা মহাবিশ্ব বলতে যা বুঝি তা সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এরপর আল্লাহ তার চারজন অবশিষ্ট ফেরেশতাকে জোর করবেন ।জিব্রাইল আলাই সালাম, মিকাইল আলাইহিসালাম , ইসরাফিল আলাইহি সালাম  এবং মালাকুল মাউত হঠাৎ আজরাইল আলাই সালাম । আল্লাহতালা মালাকুল মউত কে বলবেন একে একে মিকাইল আলাইহিসালাম ইসরাফিল আলাই সালাম এবং জিব্রাইল আলাই সালাম এর রুহ নিয়ে নিতে।

পরিশেষে আল্লাহ মালাকুল মাউতকে হুকুম করবেন মৃত্যুবরণ করার জন্য। এবং স্বয়ং মালাকুল মাউত মৃত্যুবরণ করবে।

“এ ভূপৃষ্ঠের প্রতিটি জিনিসই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং  তোমার মহিয়ান ও দয়াবান রবের সত্তাই অবশিষ্ট থাকবে “

এরপর আল্লাহ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করবেন  আজ সব কর্তিত্ব কার জন্য। তাকে উত্তর দেয়ার জন্য কেউ থাকবে না। তখন তিনি নিজেই নিজেকে উত্তর দিবেন, আল্লাহর জন্য যিনি এক ও মহা পরাক্রান্ত। আল্লাহ তার জ্ঞান অনুযায়ী বিচার দিবসের জন্য  পৃথিবীতে এক প্রকাণ্ড সমতল ভূমিতে পরিণত করবেন। যদিও সেই বমি হবে বিরাট পৃথিবীর সময়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জন্ম নেয়া প্রতিটি মানুষ জিন ও জীবজন্তু। তাই সেই পুরো ভূমিটি ভরপুর হয়ে যাবে। সেই সমতল ভূমিতে  মিশে আছে হাজার হাজার বছর ধরে কবর দিয়ে আসা সেই মেরুদন্ড গুলির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা । আল্লাহ সেই ভূমিতেই এক বিশেষ দৃষ্টি পাঠিয়ে দিবেন ।সেই বৃষ্টির পানি প্রাচীন সেই ধ্বংসপ্রায় অবশিষ্ট দেহের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা থেকে বেড়ে উঠবে এক নতুন দেহ।

বারযাখের জীবনের সেই ঘুমন্ত আত্মা জেগে উঠবে এই নতুন শরীরে। আবারো শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হলো ততক্ষণে ফেরেশতাদের পুনরুজ্জীবিত করা হয়ে গেছে। আবারো এক প্রকাণ্ড শব্দে কেঁপে উঠবে নতুন এই  সমতল ভূমি। সেই কোম্পানির সাথে সাথে আপনি হাত-পা ছুঁড়ে বেরিয়ে আসবেন মাটি থেকে। চোখ মুখ থেকে ধুলো মুছে আপনি চার দিকে তাকাচ্ছেন অনেক অনেক গভীর ঘুম থেকে উঠার পরে আপনার নতুন লাগছে সবকিছুই। আপনার চারিপাশে অগণিত মানুষের ভিড় মানুষ পশুপাখি ফেরেশতা চারদিকে ছোটাছুটি করছে। তখন আপনিও বাকিদের সাথে ছুটতে শুরু করেন এবং বুঝতে পারেন বিচার দিবস শুরু হয়ে গেছে।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close