ইসলামিককবরের আযাবজীবন - মৃত্যু - জীবন

কবরের আযাব (জীবন – মৃত্যু – জীবন: পর্ব ৩)

জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয়েছে আপনার কবর প্রশস্ত করে দেয়া হয়েছে কবরে বইছে সুমধুর বাতাস।পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সুমধুর সাগরের পাড়ে বসে আপনার যত ভালো লাগতো তার চেয়েও অনেক বেশি তৃপ্ত আপনার মন. আপনার প্রতি আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের কথা স্মরণ করতে করতে আপনি ভাবতে থাকেন সেসব কবরবাসীর কথা যাদের পরিস্থিতি আপনার থেকে অনেকটাই ভিন্ন। আপনার মনে পড়ে যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর কথা। তিনি কবরের আজাবের বিভিন্ন বিবরণ দিয়ে গেছেন যেন আমরা সকলে সতর্ক থাকি। বোখারির হাদিসে আছে  এক দিন রাসুল সাঃ স্বপ্নে কবরের আজাবের কিছু বিবরণ দেখেছিলেন।

যা তিনি আমাদের শেখানোর উদ্দেশ্যে বর্ণনা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন দু’জন লোক এসে তার দুহাত ধরে জেরুজালেমে নিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ তিনি দুজন ব্যক্তিকে দেখলে এক ব্যক্তি বসে আছে আর এক ব্যক্তি লোহার আখড়া হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি টি লোহার  আখড়া টা নিয়ে বসে থাকা ব্যক্তির মুখে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল এবং এমনভাবে টেনে বের করছিল যে সেই ব্যক্তির এক পাশের গাল পুরোপুরি ছেড়ে যাচ্ছিল।

এরপর সে একইভাবে তার অন্য গালে আঘাত করছিল। এবং ততক্ষণে প্রথম গালটি আবার ঠিক হয়ে যাচ্ছিল। এভাবে করে তার শাস্তি চলতে থাকলো। রাসুল সাঃ জানতে চাইলেন এসব কেন হচ্ছে। তখন তার সাথে ফেরেশতারা বলছিল চলুন চলুন এসব পরে হবে অর্থাৎ ব্যাখ্যা পরে হবে। এরপর তিনি চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা একজন ব্যক্তির পাশে এসে উপস্থিত হলেন। তার মাথার কাছে পাথর হাতে একজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে, সেই পাথর টা দিয়ে তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছিল। নিক্ষিপ্ত সেই পাথরটা ধরে গড়িয়ে যাওয়ার ফলে নিক্ষিপ্ত ব্যক্তি সেই পাথরটা তুলে ফিরে আসতে আসতেই তার মাথা আবার জোড়া লেগে যাচ্ছিল। এভাবেই বারবার তার মাথা ভেঙে চুরমার হতে লাগলো। রাসুল সাঃ জিজ্ঞেস করলেন এই ব্যক্তিটি কে তখন ফেরেশতারা আবারও বললেন চলুন চলুন এসব পরে হবে অর্থাৎ ব্যাখ্যা পরে হবে।

এরপর তারা একটি গর্তে পৌছলেন যা অনেকটা তন্দুর এর মত। গর্তের কবি আগুন জ্বলছিল আর সে গড়তে ছিল অসংখ্য উলঙ্গ নর নারী। আগুনটা নিচ থেকে তাদের কাছে  দেয়ে আসছিল আর তারা জোরে জোরে চিৎকার করে উঠছিল। আবারো রাসুল সাঃ তাদের ব্যাপারে প্রশ্ন করলেন আবারো ফেরেশতারা বলল চলুন চলুন এসব পরে হবে অর্থাৎ ব্যাখ্যা পরে হবে। এরপর তারা একটি নদীর কাছে এসে হাজির হলেন যে নদী দিয়ে বয়ে চলছিল রক্ত। সেই রক্তের নদীর মাঝখানে দাঁড়ানো ছিল একটি লোক ।নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ছিল একজন লোক নদীর মাঝখানে লোকটি  নদী থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করলেই সেই লোকটি পাথর দিয়ে তার মুখে নিক্ষেপ করছিল এতে সে আগের জায়গায় ফিরে যাচ্ছিল। এভাবে সেই লোকটি যতবার নদীর তীরে আসতে চেষ্টা করে অতঃপর সেই লোকটি পাথর নিক্ষেপ করে তাকে আগের জায়গায় যেতে বাধ্য করে।

এরপর নবীজী সাঃ বেশ কিছু আশ্চর্য দৃশ্য দেখলেন এবং সবশেষে তিনি যা যা দেখলেন সেগুলোর ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। তখন ফেরেশতারা বলল আপনি প্রথমে যে ব্যক্তির গাল ছিড়ে ফেলতে দেখলেন সে একজন মিথ্যাবাদী সেই মিথ্যে কথা বলে বেড়াতো। তার বলা মিথ্যা কথা ক্রমাগত বর্ণিত হয়ে দূর দূরান্তে পৌঁছে যেত ।কেয়ামত পর্যন্ত কবরে এভাবে শাস্তি পেতে  থাকবে। যে ব্যক্তি কে পাথর মেরে মাথা ভেঙে ফেলা হচ্ছিল সে এমন ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তাআলা কোরআনের শিক্ষা দান করেছিলেন কিন্তু সে রাতের বেলা কোরআন না পড়েই ঘুমিয়ে যেত এবং দিনের বেলা কোরআন অনুযায়ী আমল করত না। সেও কেয়ামত পর্যন্ত এভাবেই শাস্তি পেতে থাকবে। গর্তের মধ্যে আপনি যাদের দেখেছিলেন তারা ছিল ব্যভিচারী ।আর রক্তের নদীতে আপনি যাকে দেখলেন সে ছিল সুদখোর ।

বুখারী ও মুসলিম শরীফের আরেকটি হাদীসে আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন ।দুই কবরবাসীকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে কিন্তু তারা এমন পাপের জন্য শাস্তি পাচ্ছে যা থেকে বিরত থাকা খুব কষ্টকর ছিল না। একজন অন্য জনের নামে মিথ্যা বলে বেড়াতো এবং আরেকজন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার পরে ভালোভাবে  পরিষ্কার করে নিত না। বারযাখের জীবনে চুরি করার শাস্তি ও বেশ ভয়ানক ।বোখারি ও মুসলিমের আরেকটি হাদীসে রয়েছে খাইবারের যুদ্ধ রিফা আহ জায়েদ নামে একজন দাস শহীদ হন ।বাকিরা তার প্রশংসা করে বলছিলেন সে তো শহীদের মর্যাদা পেয়ে গেল। তখন রাসূল সাঃ বলেন সে শহীদ হওয়া সত্বেও এখন শাস্তি পাচ্ছে।

একদিন সে ছোট্ট একটি কাপড় চুরি করেছিল এখন সেই কাপড় আগুন হয়ে তাকে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। রাসুল সাঃ তার ইসরা ও মেরাজের যাত্রায় একদল লোকদেরকে দেখেছিলেন যাদের ঠোঁট আগুনের কাঁচি দিয়ে কেঁটে ফেলা হচ্ছিল ।জিব্রাইল আলাই সাল্লাম বলেছিলেন তারা তোমার উম্মত দের ভালো কাজ করার উপদেশ দিত কিন্তু  তারাই সেই ভালো কাজগুলো করত না। তারা কুরআন অর্থ কিন্তু বুঝতো না। এই আজ আজাব গুলো নিঃসন্দেহে ভয়ানক। কিন্তু আমরা অনেকেই এগুলো সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই না।

আমরা শুধুমাত্র আল্লাহর রহমত ও ভালবাসার গল্প শুনতে চাই। আবার আমরা অনেকে প্রশ্ন করে ফেলে যে আল্লাহ বাবা-মায়ের চেয়ে বহু বহুগুণে ভালোবাসেন সেই আল্লাহ কেন আমাদেরকে এমন শাস্তি দিবেন। আবার অনেকেই বলে ইসলাম শান্তির ধর্ম কিন্তু এখানে এমন ভয়ংকর শাস্তি কেটে ফেলা পুড়িয়ে ফেলা এসবের কথা কেন বলা হয়। বাস্তবে আমরা যখন আল্লাহর আদেশ অমান্য করি ও অন্যায় কাজ করি সেই কাজটা কতটুকু  কুৎসিত তা দুনিয়ার জীবনে বোঝা যায় না। আল্লাহ কত মহান তার আদেশ অমান্য করা কেমন ভয়ঙ্কর একটি কাজ তার পরিণতি আসলে কত প্রকাণ্ড তা আমরা বুঝতে পারি না।

বুঝতে পারি না বলে আমরা শুধুমাত্র আল্লাহর অসীম রহমত নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। তার পরিপূর্ণ ন্যায় বিচারের কথা ভাবতে ভালোবাসি না।  একটা খারাপ কাজ করার পরিনতি সেই কবরের আজাবের সমানি ভয়াবহ ।আল্লাহ যেহেতু আমাদের ভালোবাসেন এবং জান্নাতে যাওয়ার পথ খুঁজে দেন তাই তিনি আমাদের তাৎক্ষণিক শাস্তি দেন না বরং আমাদের সারাটা জীবন দিয়ে দেন ফিরে আসার আহবান জানাতে থাকেন। বিভিন্ন ভাবে আমাদের ডাকতে থাকেন এবং ফিরে আসা মাত্রই আমাদের ক্ষমা করে দেন। এর পরেও যখন আমরা তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করতেই থাকে করতেই থাকি ।তখন তিনি আমাদের পবিত্র বার্তা পাঠিয়ে জানান আমরা নিজেদেরকে কত ভয়ানক পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছি।

অথচ আমরা সেই  পরিণতি থেকে শিক্ষা লাভ না নিয়ে বলি আমাদের এত ভয়ংকর কথা কেন বলা হচ্ছে। এত শাস্তি এত কষ্টের কথা কেন তুলে ধরা হচ্ছে। এই চিত্র তুলে ধরার মাঝেই যে অসীম মমতা রয়েছে অসীম রহমত রয়েছে তা আমরা বুঝতে চাই না। তবে এমন একটা দিন আসবে যেদিন প্রত্যেকটা মানুষই সত্যকে বুঝতে পারবেবাস্তবতা পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণ করে মানবজাতির সামনে হাজির হবে।কিয়ামতের দিবস বিচার দিবস বহু নামে পরিচিত সেই দিনটি নিয়ে আলোচনা হবে পরের পর্বগুলোতে।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close